মেডিকেল ভর্তি প্রস্তুতি: নিউটনিয়ান বলবিদ্যা

একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সহায়িকা, যা আপনার প্রস্তুতিকে করবে আরও সহজ ও কার্যকর।

বল এবং বিভিন্ন প্রকার বলের পার্থক্য

বলের সংজ্ঞা ও বৈশিষ্ট্য

সংজ্ঞা: যা স্থির বস্তুর উপর ক্রিয়া করে তাকে গতিশীল করে বা করতে চায় বা যা গতিশীল বস্তুর উপর ক্রিয়া করে তার গতির পরিবর্তন করে বা করতে চায় তাকে বল বলে।

সমীকরণ: F = ma   |   মাত্রা: [F] = [MLT-2]

স্পর্শ বল ও অস্পর্শ বল

স্পর্শ বল (Contact Force) অস্পর্শ বল (Non-contact Force)
যে বল সৃষ্টির জন্য দুটি বস্তুর প্রত্যক্ষ সংস্পর্শ প্রয়োজন, তাকে স্পর্শ বল বলে। যে বল সৃষ্টির জন্য দুটি বস্তুর সংস্পর্শ প্রয়োজন হয় না, তাকে অস্পর্শ বল বলে।
উদাহরণ: ঘর্ষণ বল, টানা বল, সংঘর্ষের ফলে সৃষ্ট বল, সান্দ্র বল। উদাহরণ: মহাকর্ষ বল, তড়িৎ চুম্বকীয় বল, নিউক্লিয় বল।

মৌলিক বল (Fundamental Forces)

যে সকল বল মূল বা অকৃত্রিম, অর্থাৎ অন্য কোনো বল থেকে উৎপন্ন হয় না বরং অন্যান্য বল এই সকল বলের কোনো না কোনো রূপের প্রকাশ, তাদেরকে মৌলিক বল বলে। প্রকৃতিতে মৌলিক বল ৪ প্রকার।

চার প্রকার মৌলিক বলের তুলনা

বিষয় মহাকর্ষ বল তড়িৎ চুম্বকীয় বল দুর্বল নিউক্লিয় বল সবল নিউক্লিয় বল
বিনিময় কণা গ্রাভিটন ফোটন বোসন কণা মেসন/গ্লুওন
ধর্ম আকর্ষণ ধর্মী আকর্ষণ ও বিকর্ষণ ধর্মী বিকর্ষণ ধর্মী আকর্ষণ ধর্মী
পাল্লা অসীম অসীম স্বল্প (10-18m) অতি স্বল্প (10-15m)
আপেক্ষিক সবলতা 1 1039 1030 1041
উদাহরণ গ্রহ-নক্ষত্রের গতি আণবিক গঠন, স্থিতিস্থাপক বল তেজস্ক্রিয় নিউক্লিয়াসের বিটা ক্ষয় নিউক্লিয়াসে প্রোটন ও নিউট্রনকে আবদ্ধ রাখা

গুরুত্বপূর্ণ তথ্য:

  • সবচেয়ে শক্তিশালী বল: সবল নিউক্লিয় বল
  • সবচেয়ে দুর্বল বল: মহাকর্ষ বল
  • বলের সক্রিয়তার ক্রম: সবল নিউক্লিয় বল > তড়িৎ চুম্বকীয় বল > দুর্বল নিউক্লিয় বল > মহাকর্ষ বল।
  • সালাম-ওয়াইনবার্গ তত্ত্ব দুর্বল নিউক্লিয় বলতড়িৎ চুম্বকীয় বলের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করে।

নিউটনের গতিসূত্র এবং সীমাবদ্ধতা

১৬৮৭ সালে স্যার আইজ্যাক নিউটন তার বিখ্যাত গ্রন্থ "Philosophiæ Naturalis Principia Mathematica" -তে বস্তুর ভর, গতি ও বলের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপন করে তিনটি সূত্র প্রদান করেন।

সীমাবদ্ধতা

ভরবেগ ও ভরবেগের সংরক্ষণ সূত্র

সংজ্ঞা: কোনো বস্তুর ভর ও বেগের গুণফলকে তার ভরবেগ বলে। এটি একটি ভেক্টর রাশি। গতি জড়তা ভরবেগের সমানুপাতিক।

ভরবেগ (P) = ভর (m) × বেগ (v)   |   একক: kg·ms-1   |   মাত্রা: [MLT-1]

ভরবেগের সংরক্ষণ সূত্র

একাধিক বস্তুর মধ্যে শুধু ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া বল ছাড়া অন্য কোনো বাহ্যিক বল ক্রিয়া না করলে, যেকোনো দিকে তাদের মোট রৈখিক ভরবেগ অপরিবর্তিত থাকে।

m1u1 + m2u2 = m1v1 + m2v2

উদাহরণ: বন্দুকের পশ্চাৎবেগ, রকেটের গতি, নৌকা থেকে লাফ দেওয়া।

জড়তা, ঘাত বল, বলের ঘাত এবং রকেটের গতি

জড়তা (Inertia)

বস্তু যে অবস্থায় আছে, চিরকাল সেই অবস্থায় থাকতে চাওয়ার যে প্রবণতা বা ধর্ম, তাকে জড়তা বলে।

ঘাত বল (Impulsive Force) ও বলের ঘাত (Impulse of Force)

ঘাত বল: খুব অল্প সময়ের জন্য খুব বড় মানের যে বল কোনো বস্তুর উপর প্রযুক্ত হয়, তাকে ঘাত বল বলে। যেমন - ব্যাট দিয়ে ক্রিকেট বলে আঘাত করা।

বলের ঘাত: বল এবং বলের ক্রিয়াকালের গুণফলকে বলের ঘাত বলে। বলের ঘাত বস্তুর ভরবেগের পরিবর্তনের সমান।

বলের ঘাত (J) = F × t = Δp = m(v - u)

রকেটের গতি

রকেটের গতি ভরবেগের সংরক্ষণ নীতির উপর ভিত্তি করে কাজ করে। রকেটে জ্বালানি হিসেবে তরল হাইড্রোজেন এবং দহনের জন্য তরল অক্সিজেন ব্যবহৃত হয়।

রকেটের ত্বরণ, a = (v/M) * (Δm/Δt) - g

এখানে, v = নির্গত গ্যাসের বেগ, M = রকেটের তাৎক্ষণিক ভর, (Δm/Δt) = জ্বালানি দহনের হার, g = অভিকর্ষজ ত্বরণ।

ঘর্ষণ ও ঘর্ষণের প্রকারভেদ

সংজ্ঞা: দুটি বস্তু পরস্পরের সংস্পর্শে থেকে যখন একের ওপর দিয়ে অপরটি চলতে চেষ্টা করে বা চলে, তখন বস্তুদ্বয়ের স্পর্শতলে গতির বিরুদ্ধে যে বাধার সৃষ্টি হয়, তাকে ঘর্ষণ বলে।

ঘর্ষণ প্রধানত ৪ প্রকার: (i) স্থিতি ঘর্ষণ, (ii) গতীয় ঘর্ষণ, (iii) আবর্ত ঘর্ষণ, (iv) প্রবাহী ঘর্ষণ।

ঘর্ষণ কোণ (Angle of Friction) ও নিশ্চল কোণ (Angle of Repose)

সীমান্তিক ঘর্ষণ বল (fs) এবং অভিলম্ব প্রতিক্রিয়ার (R) অনুপাতকে স্থিতি ঘর্ষণ গুণাঙ্ক (μs) বলে।

μs = fs / R = tan λ = tan θ    ⇒    λ = θ

যেখানে, λ হলো ঘর্ষণ কোণ এবং θ হলো নিশ্চল বা স্থিতিকোণ।

ঘর্ষণের সুবিধা

  • ঘর্ষণের জন্য আমরা হাঁটতে পারি।
  • গাড়ির চাকা রাস্তায় চলতে পারে।
  • কাঠে পেরেক আটকে থাকে।

ঘর্ষণের অসুবিধা

  • যন্ত্রপাতির ক্ষয় হয়।
  • তাপ উৎপন্ন হয়ে শক্তি অপচয় হয়।
  • যন্ত্রের দক্ষতা কমে যায়।

কেন্দ্রমুখী, কেন্দ্রবিমুখী বল এবং রাস্তার ব্যাংকিং

কেন্দ্রমুখী বল (Centripetal Force)

কোনো বস্তু যখন বৃত্তাকার পথে ঘোরে, তখন যে বল বৃত্তের কেন্দ্রের দিকে ক্রিয়া করে বস্তুটিকে বৃত্তাকার পথে ঘুরতে বাধ্য করে, তাকে কেন্দ্রমুখী বল বলে।

Fc = mv2/r = mω2r

এটি একটি কার্যহীন বল, কারণ বলের দিক ও সরণের দিক পরস্পর লম্ব, তাই কৃতকাজ শূন্য।

কেন্দ্রবিমুখী বল (Centrifugal Force)

বৃত্তাকার পথে ঘূর্ণায়মান বস্তুর উপর কেন্দ্র থেকে বাইরের দিকে অনুভূত একটি আপাত বা অলীক বলকে কেন্দ্রবিমুখী বল বলে। এটি কেন্দ্রমুখী বলের প্রতিক্রিয়াস্বরূপ সৃষ্টি হয়।

রাস্তার ব্যাংকিং (Banking of Roads)

বাঁকের মুখে দুর্ঘটনা এড়ানোর জন্য রাস্তার বাইরের প্রান্ত ভিতরের প্রান্তের চেয়ে কিছুটা উঁচু করে তৈরি করা হয়। একে রাস্তার ব্যাংকিং বলে। প্রয়োজনীয় কেন্দ্রমুখী বল যোগান দেওয়াই এর উদ্দেশ্য।

ব্যাংকিং কোণ, tan θ = v2 / rg

অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ টপিক

টর্ক বা বলের ভ্রামক (Torque)

যে বলের ক্রিয়ায় কোনো বস্তু একটি অক্ষ বা বিন্দুর সাপেক্ষে ঘুরতে থাকে, তাকে টর্ক বলে। এটি ঘূর্ণন গতির সৃষ্টি করে।

τ = r × F = Iα   |   একক: N·m   |   মাত্রা: [ML2T-2]

জড়তার ভ্রামক (Moment of Inertia)

কোনো অক্ষের সাপেক্ষে একটি বস্তুর ঘূর্ণন জড়তাকে জড়তার ভ্রামক বলে। রৈখিক গতিতে ভরের যে ভূমিকা, ঘূর্ণন গতিতে জড়তার ভ্রামকের সেই একই ভূমিকা।

I = Σmr2   |   একক: kg·m2   |   মাত্রা: [ML2]

সংঘর্ষের প্রকারভেদ (Types of Collision)

স্থিতিস্থাপক সংঘর্ষ (Elastic Collision) অস্থিতিস্থাপক সংঘর্ষ (Inelastic Collision)
যে সংঘর্ষে ভরবেগ ও গতিশক্তি উভয়ই সংরক্ষিত থাকে। যে সংঘর্ষে শুধুমাত্র ভরবেগ সংরক্ষিত থাকে কিন্তু গতিশক্তি সংরক্ষিত থাকে না।
বাস্তবে পূর্ণ স্থিতিস্থাপক সংঘর্ষ পাওয়া যায় না। বাস্তবের সকল সংঘর্ষই অস্থিতিস্থাপক।
উদাহরণ: দুটি কাঁচের বলের মধ্যে সংঘর্ষ। উদাহরণ: কাদার বলের সাথে কোনো বস্তুর সংঘর্ষ, বুলেট লক্ষ্যবস্তুতে আটকে যাওয়া।

অনুশীলনী ও বিগত বছরের প্রশ্ন

আপনার প্রস্তুতি যাচাই করার জন্য এখানে কিছু প্রশ্ন এবং সমাধান দেওয়া হলো।

গাণিতিক প্রয়োগ

প্রশ্ন: 6N এর একটি বল 3kg ভরের একটি স্থির বস্তুর উপর ক্রিয়া করলে 5 sec পর বস্তুটি কত দূরত্ব অতিক্রম করবে?

সমাধান: F = ma ⇒ a = F/m = 6/3 = 2 ms-2.
S = ut + ½at2 = 0 + ½ * 2 * 52 = 25m.

শর্টকাট: S = Ft2 / 2m = (6 × 52) / (2 × 3) = 25m

প্রশ্ন: 200 kg ভরের একটি স্থির নৌকা থেকে 20 kg এবং 25 kg ভরের ২টি বালক যথাক্রমে 10ms-1 এবং 8ms-1 বেগে একই দিকে লাফ দিলে নৌকাটি কত বেগে চলতে শুরু করবে?

সমাধান: ভরবেগের সংরক্ষণ সূত্রানুসারে, Mv + m1u1 + m2u2 = 0
v = -(m1u1 + m2u2) / M = -(20×10 + 25×8) / 200 = -2 ms-1. (নৌকাটি বিপরীত দিকে 2ms-1 বেগে চলবে)

বিগত বছরের প্রশ্ন (MAT: 20-21)

প্রশ্ন: 10 kg বস্তু (object) যদি 12 ms-1 বেগে চলে, তবে এর ভরবেগ হবে-

  1. 120 kgms-1
  2. 10 kgms-1
  3. 12 kgms-1
  4. 1.2 kgms-1

উত্তর: (a) 120 kgms-1.
ব্যাখ্যা: ভরবেগ p = mv = 10 kg × 12 ms-1 = 120 kgms-1.